কালকেউটের সুখ : সবহারা মানুষের আর্তনাদ

১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, ১৪:৫৭

সৈয়দ রশিদ আলম

একুশে বই মেলায় তথাকথিত প্রেমের উপন্যাসের সংখ্যা কত তা কোনো মহাজাতকের পক্ষেও বলা সম্ভব নয়। কারণ প্রকাশকরা জানেন এসব প্রেমের ‘উপন্যাস’ ঝালমুড়ির মতো বিক্রি হয়, হবে। কিন্তু উপন্যাসে একদল সর্বহারা মানুষের কথা বলার মতো ঔপন্যাসিকের সংখ্যা খুব বেশি নয়।

এবারের একুশে গ্রন্থ মেলায় ‘বেগানা’,‘ হীরকডানা’, ‘জলেস্বর’, ‘রাজনটী’র মতো পাঠকনন্দিন উপন্যাসের লেখক স্বকৃত নোমানের ‘কালকেউটের সুখ’ উপন্যাসটি মূলত স্বজনহারা, সবহারা মানুষের আর্তনাদের দলিল। চোখ অশ্রুসজল  করার মতো প্রামাণ্য উপন্যাস।

উপন্যাসের প্রধান চরিত্র কেশব মাস্টার। একজন কেশব মাস্টার অশিক্ষায় জর্জরিত সুন্দরবনের গরানপুরের শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন। কিন্তু একজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেবে তা ধর্মব্যবসায়ীদের কাছে হারাম বলে বিবেচিত হচ্ছে। এসব কূপমুণ্ডকদের দান-খয়রাত নেওয়ার ব্যাপারে কোনো আপত্তি নেই, আপত্তি শুধু শিক্ষার আলো নেওয়ার বেলায়। বিধর্মী কারো সাথে মেলামেশা করলে নরকে যেতে হবে, এই কুশিক্ষাটা তারা তাদের উত্তরসূরীদের শিখিয়ে দিচ্ছেন, যার ফলাফল আমরা গভীর দুঃখের সাথে লক্ষ করছি। প্রতিমুহূর্তে সর্বস্বান্ত সর্বহারা সংখ্যালঘুদের জমি একের পর এক হাতছাড়া হচ্ছে। আমরা তো বুড়োগোয়ালিনি, দাতিনাখালী, নূরনগর, মুন্সীগঞ্জ এলাকার কথা জানি। এসব জনপদে একসময় ছিল হিন্দু, সাঁওতাল, ওরাও, মুণ্ডাদের বাস। এখন তাদের খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

উপন্যাসের আরেক চরিত্র আলাউদ্দিন। লেখকের কলমে সে যুগের খাননাস, ইবলিস শয়তানও এই ‘আলাউদ্দিন শয়তান’কে ভয় পায়। এই শয়তানের শয়তানির নমুনা উপন্যাসের পাতায় পাতায় দেখতে পাওয়া যাবে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার পাকিস্তানিরা বাঙালিদের ওপর যতটা অত্যাচার চালিয়েছে তার চেয়ে বেশি অত্যাচার চালিয়েছে অসহায় হিন্দুদের ওপর। শান্তি কমিটি, আলবদর, আল শামসারাও হানাদার পাকিস্তানিদের সাথে ধর্মের নামে হিন্দুদের ধর্ষণ, লুটতরাজ, হত্যা করেছে। ভিটেমাটি ছাড়া করেও তাদের অন্তরের জ্বালা মেটেনি। তারপরও গরানপুরবাসীর একটি দল বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে কোথাও যেতে রাজি ছিল না। কিন্তু কালকেউটের বিষ বহনকারী পাকিস্তানি হায়েনারা চিৎকার করে বলছে, ‘কলেমা পর মালাউনের বাচ্চা।’ কিন্তু অনন্ত মণ্ডলেরর মতো সনাতন ধর্ম বিশ্বাসী মানুষের কাছে, ধর্ম ত্যাগের চাইতে মৃত্যুই উত্তম বলে বিবেচিত। ধর্মত্যাগ না করার ফলে অনন্ত মণ্ডলের কাঠের ঘরটায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল হানাদাররা।

সুন্দরবন সংলগ্ন গ্রামগুলোতে লড়াকু মানুষদের কর্মসূত্রে প্রায়ই বনের গভীরে যেতে হয়। সেখানে বাঘ, সাপ, কুমির, তাদের ওপর যতটা না অত্যাচার চালিয়েছে তার চাইতে শতভাগ বেশি অত্যাচার চালিয়েছে ধর্মের নামে একদল পশু। ভিন্ন ধর্ম হওয়ার কারণে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কালকেউটে সাপের চেয়েও ভয়ঙ্কর বিষ বহনকারী ধর্ম ব্যবসায়ীরা সুন্দরবন সংলগ্ন গ্রামগুলো যে অত্যাচার, নির্যাতন চালিয়েছিল ‘কালকেউটের সুখ’ উপন্যাসে তা বেদনার সাথে তুলে ধরা হয়েছে।

সাতচল্লিশে দেশ ভাগের পর হিন্দু-মুসলমানরা ভেবেছিল মিলেমিশে তারা এ দেশে বসবাস করবে। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। ইতিহাস সেটার স্বাক্ষী। ফিলিস্তিন থেকে বিতাড়িত মুলসমানরা, আরাকান থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গারা, তিব্বত থেকে বিতাড়িত বৌদ্ধরা, বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত সনাতনদের আর্তনাদ অশ্রুর বর্ষণ একই রকম। পৃথিবীর সংখ্যালঘু মানুষের কান্না থেমে যায়, কিন্তু তাদের ওপর অত্যাচারের মাত্রা কমে না। কথায় কথায় মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা, সিনাগগ, গুরুদোয়ারা একদল মানুষ জ্বালিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু তাদের অন্তর থেকে ধর্মবিশ্বাস পুড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ সৃষ্টিকর্তা কোনো গৃহে বন্দি থাকেন না, তিনি থাকেন নির্যাতিতদের অন্তরে।

স্বকৃত নোমান তাঁর ‘কালকেউটের সুখ’ উপন্যাসে কালকেউটের বিষ বহনকারী একদল মানবরূপী দানবদের কথা তুলে ধরেছেন শিল্পিত ভাষায়। অত্যন্ত পরিশ্রমের ফসল এই উপন্যাস। অসামান্য দরদ দিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করে সমগ্র সুন্দরবন সংলগ্ন জনপদ ভ্রমণ করে তিনি উপন্যাসটি লিখেছেন, পড়লে বোঝা যায়। আমরা এই অসামান্য সৃষ্টিশীল উপন্যাসের বহুল প্রচার ও পাঠক প্রিয়তা প্রত্যাশা করি।

বইটি প্রকাশিত হয়েছে জাগৃতি প্রকাশনী থেকে। প্রচ্ছদ করেছেন আমজাদ আকাশ। মূল্য ৩৩৫ টাকা।